পবিত্র কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর নিদর্শনাবলি

পবিত্র কুরআনে হযরত ঈসা (আ.)-এর বেশ কিছু নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তাঁর পাখি সৃষ্টির ক্ষমতা, অন্ধত্ব-সহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধী সারানোর এবং মৃতকে জীবিত করার নিদর্শন। (পবিত্র কুরআন ৩:৫০)

এসব বিশেষ ধরনের নিদর্শনগুলোকে আহমদী মুসলমানগণ রূপক হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। ঈসা (আ.)-কে গ্রহণকারী ব্যক্তিরা জাগতিক ও প্রবৃ্ত্তির কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে আরোহণ করে আধ্যাত্মিক জগতে উচ্চ স্তরে পাখির মতোই উড্ডয়ন করতেন। একইভাবে, রূপকভাবে, তিনি আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধদেরকে দৃষ্টি-শক্তি ফিরিয়ে দেন এবং আধ্যাত্মিকভাবে মৃতদেরকে জীবিত করেন।

যীশু স্বয়ং তার সময়কার শত্রুদেরকে ঈমানের (বিশ্বাসের) ক্ষেত্রে তাদের কপটতাপূর্ণ আচরণের কারণে “অন্ধ” বলে আখ্যায়িত করেছেন (মথি ২৩:২৬)। আরোগ্য সম্পর্কে তিনি যেখানেই কিছু বলেছেন সেখানে সেটির বাচনভঙ্গী ও প্রসঙ্গ দৈহিক আরোগ্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের অর্থ বহন করে। আর এটাও মনে রাখতে হবে যে, যীশু কথাবার্তার ক্ষেত্রে রূপকের আশ্রয় নিতেন। যেমন, তার একটি বিখ্যাত বাণী হলো, “মৃতরাই মৃতদেরকে কবর দিক” (মথি ৮:২২)।

পবিত্র কুরআনেও অবিশ্বাসীদেরকে অন্ধ, বধির ও মূক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (পবিত্র কুরআন ২:১৯) এবং মহানবী (সা.) তাদেরকে ‘জীবন’ দিয়েছেন এবং সে ধরনের মৃত্যু থেকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন (পবিত্র কুরআন ৮:২৫)।

আক্ষরিক ব্যাখ্যা

বাইবেলে বর্ণিত নিদর্শনগুলোর আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রতি জোর দেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন। এমনকি বাইবেলের প্রামাণ্য তফসীর বা ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ হার্পার্স বাইবেল কমেন্ট্রিতে এত দূর পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, পুনরুত্থান বিষয়ক নিম্নোক্ত নিদর্শনটি উপেক্ষা করা উচিত।

কবরগুলো উন্মুক্ত হয়ে যায় আর বহু সাধু ব্যক্তি, যারা মারা গিয়েছিলেন, তারা জীবিত হয়ে যান। তারা কবর থেকে বহির্গত হন এবং যীশুর পুনরুত্থানের পর তারা পবিত্র নগরটিতে প্রবেশ করেন এবং বহু লোকের সামনে আত্মপ্রকাশ করেন। (মথি ২৭:৫২-৫৩)

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এসব আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন তাঁর সুবিখ্যাত পুস্তক মসীহ হিন্দুস্তান মে -তে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বাইবেল আসলে একটি আধ্যাত্মিক দিব্যদর্শনের (কাশফের) বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছে (মসীহ হিন্দুস্তান মে – ১ম অধ্যায়)। আর, কাশফের ভাষায়, কেউ যদি দেখেন যে, “মৃত ব্যক্তিরা কবর থেকে বের হয়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন, তাহলে এর ব্যাখ্যা হবে কোন বন্দী তার বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাবেন এবং তিনি তার নির্যাতনকারীদের হাত থেকে উদ্ধার পাবেন।” প্রসঙ্গক্রমে, এই ব্যাখ্যার সমর্থন গুস্তাভুস মিলারের পুস্তক 10,000 Dreams Interpreted-এও পাওয়া যায়।

বিস্ময়করভাবে, খ্রিস্টান পণ্ডিতেরা যেখানে বাইবেলের কোনো কোনো আয়াত থেকে অর্থগ্রহণের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেখানে একজন মুসলমান, যিনি প্রতিশ্রুত মসীহ্ হওয়ার দাবি করেছেন, বাইবেলের কোনো কোনো রূপকের মাঝে নিহিত সৌন্দর্য্যসমূহ উন্মোচিত করে এর সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন।

মু’জেযা এবং ঈশ্বরত্ব

অধিকন্তু, এটা মনে রাখতে হবে যে, এলিয়ও মৃতদেরকে জীবিত করেছিলেন (১ রাজাবলি ১৭:১৯-২২) অতএব, এলিয়কেও ঈশ্বর হিসেবে গণ্য না করে যীশুর ঈশ্বরত্বের সপক্ষে যুক্তি-তর্ক করা কঠিন। যীশু তার নিজের ক্ষমতাবলে এসব মু’জেযা প্রদর্শন করেছেন এবং ঈশ্বর এলিয়র মাধ্যমে কাজ করেছেন — এ রকম যুক্তিতর্ক স্বয়ং নতুন নিয়ম-এর সঙ্গেই বিরোধপূর্ণ। প্রেরিত ২:২২ বলছে: ‘হে ইস্রায়েলীয়েরা, এই সকল কথা শুন। নাসরতীয় যীশু পরাক্রম-কার্য্য, অদ্ভুত লক্ষণ ও চিহ্ন-সমূহ দ্বারা তোমাদের নিকটে ঈশ্বর-কর্তৃক প্রমাণিত মনুষ্য; তাঁহারই দ্বারা ঈশ্বর তোমাদের মধ্যে ঐ সকল কার্য্য করিয়াছেন।’